শ্রী জগন্নাথ ও তাঁর লোকায়ত অনুভব

এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন -
শ্রী জগন্নাথদেবের সিদ্ধধাম হিসেবে পুরী প্রসিদ্ধ। তবে বাংলায় জগন্নাথদেবের প্রভাব ও প্রতিপত্তি শিব, কালী, দুর্গা ইত্যাদির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। সর্বোপরি শ্রীচৈতন্যদেবের ভক্তিপ্লাবনে ভেসে যাওয়া বাংলা তাঁর পথ ধরেই শ্রীজগন্নাথভক্তিতেও একুল ওকুল এক হয়ে গেছে। সে স্রোত কেবল বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বাংলার আপামর জনসাধারণের মধ্যে জগন্নাথ তাঁর স্বতন্ত্রতার চির উজ্জ্বল। বাংলার সমস্ত দেবদেবীর মধ্যে শ্রীজগন্নাথ এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। আরো আশ্চর্যের বিষয় শ্রীজগন্নাথের মানুষী লীলায় সমস্ত অস্বাভাবিকত্ব জনমানসে অদ্ভুতভাবে সমাজের সমস্ত স্তরে অপ্রতিরোধ্য প্রভাব বিস্তার করেছে।

একমেবাদ্বিতীয়ম শ্রী জগন্নাথ

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন শ্রীজগন্নাথই আমাদের দেবতাদের মধ্যে প্রকৃত অর্থে দিব্যাঙ্গ। দিব্যাঙ্গ শব্দটা আমরা এখন ভদ্রসমাজে ‘প্রতিবন্ধী’-র প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করি। হায়, যদি নাম বদলে দিলেই মানুষের মানসিকতা বদলে যেতো! ন্যাকাচৈতন্যের মতোই আমরা শ্রীজগন্নাথ সম্পর্কেও একটা গ্রাম্য বিশেষণ ব্যবহার করি - ঠুঁটো জগন্নাথ। আজও হয়তো বাংলার কোন অজ গ্রামে শুনবেন কোন গৃহবধু তার অলস স্বামীকে ভর্ৎসনা করছেন - সারাদিন বাড়িতে ঠূঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকলে চলবে? আমরা সাধারণতঃ প্রচলিত সমস্ত দেবদেবীর মূর্তিকল্পনাতে অতিরঞ্জন ব্যবহার করি তাঁদের শক্তি এবং স্বরূপ প্রতীকায়িত করার জন্য। এর মধ্যে হাতের আধিক্য বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। বেশিরভাগ দেবদেবীর হাত দুইয়ের অধিক। দুর্গার দশ হাতে দশদিক নিয়ন্ত্রণ প্রতীকায়িত হয়। সৃষ্টির সামগ্রিকতা প্রতীকায়িত করা জন্য ব্রহ্মা চতুর্মুখ। এমন উদাহরণ সনাতন পুরাণ শাস্ত্রে অজস্র। কিন্তু শ্রীজগন্নাথ ঠিক উলটোপথে চললেন। তাঁর মূর্তিটি হল হাত পা বর্জিত। অদ্ভুত দর্শন বিস্ফারিত চোখ। কোন অর্থেই মূর্তিটির নির্মান পরিশীলিত বা সংস্কৃত নয়। এইটিই জগন্নাথ দর্শনের মূল সুর।

আরো দেখবেন, জগন্নাথ কোনভাবেই যেন নিজেকে ঈশ্বর প্রমাণে সচেষ্ট নন। তিনি স্নান করে জ্বরে পড়েন। তিনি রথে চড়ে ঘুরতে বেরোন। এহ বাহ্য! তিনি ঘুরতে বেরিয়ে প্রেমিকার বাড়িতে খাবারের লোভে আটকে পড়েন। মানুষী ব্যবহারে তিনি লীলায়িত। তিনিই বোধহয় একমাত্র ঈশ্বর যিনি আজন্ম কেবল সাধারণ মানুষ হয়ে বাঁচতে চান। শ্রীজগন্নাথের এ অপরূপ দর্শনের শিকড় খুঁজতে গেলে অনেকটি বিষয় আলোচনা করতে হয়। যার মধ্যে সমাজবিজ্ঞান তথা নৃতত্ববিজ্ঞান ধর্মতত্বের আগে চলে আসে বলে আমার বিশ্বাস। প্রচলিত পুরাণ যেখানে দেবদেবীদের রূপকথাধর্মী অলৌকিকত্বের মাধ্যমে সাধারণের বিশ্বাস অর্জন করতে চেয়েছে বা ধারণাবিস্তার করতে চেয়েছে, জগন্নাথ সেখানে স্বতন্ত্রভাবে তাঁর নিজস্বতা বজায় রেখেছেন সাধারণ মানুষী লীলাবিস্তারের মাধ্যমে।

জগন্নাথের আর একটি বিশেষ দিক তাঁর রাজসিক প্রজাপালক দর্শন। তিনি সাধারণ মানুষের মতো হলেও রাজা বটে। তাঁর রান্না এক পাত্রে দুবার হয় না। তাঁর ভোগে পদ হয় ছাপ্পান্ন রকম। এক রথে তিনি দুবার চড়েন না। পঁচিশ তিরিশ রকম তাঁর সাজ। প্রায় সমস্ত আচারেই রাজকীয়তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে। কিন্তু দেখুন এই রাজা কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর মূর্তি নির্মান হয় দারূ অর্থাৎ কাঠ দিয়ে। ভোগ রান্না হয় মাটির পাত্রে, কাঠের জ্বালে। কাঠের রথে তিনি যাত্রা করেন।

এবং অবশ্যই রথযাত্রা। অন্যান্য দেব দেবীরা মন্দিরে অবস্থান করেন। ভক্তেরা দেবদর্শনে মন্দিরে যান। শ্রীজগন্নাথ নিজেই রথযাত্রায় মন্দির ছেড়ে ভক্তদর্শনে বের হন। রথযাত্রা তাঁর রাজধর্মের সঙ্গে যেমন মানানসই, তেমনই উপযুক্ত তাঁর ভক্তবৎসল দর্শনের। বাংলার মাটিতে এমন দেবতা বিরল যিনি ভক্তের সঙ্গে মিলনের উদ্দেশ্যে নিজেই মন্দির ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন।

(রথের প্রস্তুতি)

শ্রীজগন্নাথের বিবর্তনবিমূখতা

যারা একটু আধটু ইতিহাস চর্চা করেন তারা অবশ্যই জানেন জনসমক্ষে বা রাজদরবারে আসার আগে শ্রীজগন্নাথ পূজিত হতেন প্রান্তিক শবর শ্রেণির মানুষের মধ্যে। সে সময় তাঁর মূর্তি তৈরি হতো নীল পাথরে নীলমাধব রূপে। ফলতঃ খুব স্বাভাবিকভাবেই সে মূর্তির মধ্যে প্রান্তিক লোকায়ত ‘টোটেম’ সংস্কৃতির পরিপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যাবে। সেই সূত্র ধরেই দারূমূর্তি বা অসংস্কৃত রূপকল্পনা। এটুকু বুঝতে পারলেই আপনি শ্রীজগন্নাথের রঙ, মূর্তির আলপনা থেকে শুরু করে সমস্ত আচারের মধ্যেই লোকায়ত প্রভাব অনুভব করতে পারবেন। বাঙালি এ আলোচনা দীর্ঘদিন বহুপরিসরে করেছে। বিভিন্ন বই বা আন্তর্জালে আপনি শ্রীজগন্নাথের শবর শিকড়টুকু বিস্তারে জেনে নিতে পারেন। আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য আরো একটু গভীরে।

আগম পথে শাক্ত, শৈব বা বৈষ্ণব যে তিনটি মূল পথ - তার মধ্যে শ্রীজগন্নাথ বৈষ্ণবমার্গের অন্তর্গত হয়েছেন। তবে কৃষ্ণ বা বিষ্ণুর মূলধারার উপাসনার এক্কেবারে পাশাপাশি থেকেও জগন্নাথস্যর নিজের স্বতন্ত্রতা বিশেষভাবে তাঁর আদিম টোটেম রূপ এবং সে সংক্রান্ত আচার যথাযোগ্যভাবে বজায় রেখেছেন চিরকাল। যদিও সংস্কৃত শিক্ষিতরা এই দিকটিকে স্বীকার করবেন না তাদের স্বার্থেই।

জগন্নাথের এই বিবর্তনবিমূখতা আমাদের এক গভীর আর্থসামাজিক প্রবণতাকে নির্দেশ করে। হয়তো সার্বিক পৃথিবীর সমস্ত সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই একই কথা খাটে, তবু আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় বাংলার কথাই বুঝি। আমাদের সংস্কৃতির একদিন ছিলো রাজতন্ত্র। তারপর আমরা গনতন্ত্রে এসেছি। এই পরিবর্তন খানা আমরা কেবল একরকম পরিপ্রেক্ষিতেই দেখি। একনায়কতন্ত্র থেকে সাধারণতন্ত্রে উন্নয়ন হিসেবে। যদিও আদতে পরিবর্তনখানা একেবারেই তেমন নয়। আমি বুঝি ঘোষিত একনায়কতন্ত্র থেকে অঘোষিত ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর রাজতন্ত্র। বলা যায় একটু বিবর্ধিত একনায়কতন্ত্র। এই সত্যটুকু আমরা বুঝিনে বা স্বীকার করি নে। ফলে অনেক সহজ কথা জটিলভাবে বুঝতে হয় আর কি। রাজতন্ত্রের সময় সামাজিক বিভাগ অনেকটা সরল ছিলো অবশ্যই। রাজা মূলতঃ করব্যবস্থার দিকে মনোযোগী ছিলেন। প্রজাপালন তার মূল কাজ হলেও সম্পর্কটা আদতে ছিলো করকেন্দ্রিক। অনেক রাজাই প্রজাবৎসল ছিলেন বটে, কিন্তু আসল কথা হল প্রজা তেমন রাজা নির্ভরশীল ছিলো না। ফলে বিশেষ পরিস্থিতি বা ব্যতিক্রম ছাড়া রাজা উপযাজক হয়ে প্রজাসংস্কৃতিতে তেমন অনুপ্রবেশ করতেন না। অন্ততঃ গ্রামবাংলা স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে নিজেদের প্রয়োজন নিজেই মিটিয়ে নিতে পারতো। এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আজকের দিনের তুলনায় অনেকটাই বেশি ছিলো বাংলায়। বাংলার অসীম প্রাকৃতিক সম্পদ এর অন্যতম কারন অবশ্যই।

আজকের বাংলার সংস্কৃতিতে প্রধান দুই ধারা - লোকসংস্কৃতি এবং নগরসংস্কৃতি। রাজতন্ত্রের সময়েও ব্যাপারটা খানিক এমনই ছিলো, কেবল নগরপ্রাধান্য এমন ঘোরতরভাবে আগ্রাসী হয়ে ওঠেনি। জগন্নাথে দর্শনের স্বরূপ বোঝার আগে এই দুই সংস্কৃতির ভিত্তিমূলক চরিত্রবিশ্লেষণ প্রয়োজন। বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অসামান্য গুণ হলো এর তৃণচরিত্র। এর মৃত্যু নেই। পরিবর্তন নেই। আমরা যারা গেল গেল রব তুলি তা নগরসংস্কৃতির আলোচ্যবিষয় হতে পারে, বৃহত্তর লোকসংস্কৃতি অক্ষয়, অক্ষর।
‘শক, হুণ দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন’- এ ভারত আত্মার স্বভাব। প্রচুর আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়েও লোকসংস্কৃতি তার মূলভাবটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। লোকের এ এক অলৌকিক স্বভাব। নগরসংস্কৃতির চরিত্র ঠিক এর উল্টো। সে নতুনকে সর্বদাই আগ্রহসহকারে গ্রহণ করে। সে বিশ্বনাগরিক হতে চায়। নতুনকে পরখ করে দেখতে চায় নিজের জীবনে। অপরদিকে লোক নিজের বৃত্তে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে চায়। তার কাছে নতুনের হাতছানি, বৃহতের আকর্ষণ তেমন জোরালো নয়। আমরা নাগরিক ‘শিক্ষিত’ মানসিকতায় এ কারনেই গ্রামকে রক্ষণশীল অনুন্নত, এবং শহরকে আধুনিক উন্নত ভেবে থাকি। আধুনিক কুপমণ্ডূক শিক্ষা এর বাইরে আমাদের ভাবতে শেখায়নি কোনদিন। জগন্নাথ দর্শন এই আধুনিক শিক্ষিতদের জন্য ব্রহ্মের এক নির্মম পরিহাস। আধুনিক নগরসভ্যতায় শিক্ষিত মানুষ যখন জগন্নাথপ্রীতি প্রকাশ করেন, আমার বেদম হাসি পায়। এই এক জায়গায় এসে ‘শিক্ষিত বড়োলোক’-দের জ্ঞানত বা অজ্ঞানতঃ ছোটলোকদের প্রাধান্য দিতে হয়ই। সমস্ত দেবদেবীর মধ্যে একমাত্র জগন্নাথই তাঁর শিকড়বিস্মৃত নন। আজও তাই জগন্নাথের সেবায় শবরদের অধিকার সুনিশ্চিত। আজও জগন্নাথের সমস্ত লীলায় লৌকিকত্বের আধিক্য। একমাত্রই জগন্নাথই সমাজের সমস্ত স্তরে তাঁর লোকসত্বা নিয়ে স্বরূপে বর্তমান। আধুনিক নগরসভ্যতা বোঝেও নি কখন তারা জগন্নাথের অদৃশ্য হাত ধরে লোকসংস্কৃতির অঙ্গনে গিয়ে পড়েছেন। আধুনিক শিক্ষিত বাঙালীরা নিশ্চয়ই রণজিৎ গুহ, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তথা সমাজবিজ্ঞানের ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ নামক শাখাটি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন। এ তত্বে ‘অ্যাফার্মেটিভ সাবোতাজ’ বলে একটি প্রকল্প আছে। আমি দেখতে পাই শ্রীজগন্নাথ তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শ্রীরামচন্দ্র বাঁদরের সাহায্য নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু বাঙালি বাঁদর চেনেনি। শ্রীজগন্নাথ গাছ, মাটি আর বাঁদর শ্রণির প্রান্তিক মানুষগুলোকে এমন মর্য্যাদা দিলেন যে জগন্নাথের পরিসরে তাদের আর কিছুতেই অগ্রাহ্য করা গেল না আজও।

সচল ও অচল জগন্নাথ

শিবের প্রান্তিক রূপের অভিজ্ঞান যেমন গাজন, তেমনই বিষ্ণুর লোকায়ত রূপটি হলেন শ্রীজগন্নাথ। শ্রী জগন্নাথ প্রান্তিক লোকপরিসর থেকে মূলধারার রাজসভায় এলেন বটে, কিন্তু তাঁর প্রান্তিকতার শিকড়টুকু রইলো অবিচল। ওদিকে শ্রীচৈতন্য বৈদিক অদ্বৈতবাদের জ্ঞানের ঘর থেকে ফিরে এসেছেন। তিনি অনুভব করেছেন ‘বৈদিক মেঘের ঘোর অন্ধকার’। তিনি লোকায়তের সহজতায় মুক্তির উপায় দেখছেন। জ্ঞানকে আত্মস্থ করে তিনি ভাবের সাগরে ভাসছেন। যে দর্শনখানায় তিনি উপনীত হয়েছেন সেখানা ভারি আশ্চর্য! সে দর্শনকে বলে অচিন্ত্যভেদাভেদ। অচিন্ত্য ভেদ ও অভেদ। অচিন্ত্য মানে যা চিন্তা করা যায় না। কি ভয়ানক কথা বলেন দেখি। দর্শন তো চিন্তারই বিষয়। যা চিন্তাই করা যায় না তা দর্শন কীভাবে হয়! মানে ধরুন আপনার চোখের সামনেই বিশ্বরূপ ধরে বিগবস শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছেন, আর আপনি বেমালুম দেখতেই পাচ্ছেন না। এও কি হয়? আবার হয় নাই বা বলি কী করে। একটু ভাবলে দেখবেন কথা মিথ্যা নয়। আপনার আমার চোখের সামনেই বিশ্বরূপ তো বটেই। তবে এ কেবল কথার খেলা বলে ভাবলে ভুল হবে। চৈতন্য যেমন ভাবছেন, বৈদিক অদ্বৈত ব্রহ্ম সত্য বটে, তবে সে সত্য অনুধাবনের জন্যই আত্ম প্রয়োজন। মানে ব্রহ্ম আমিই বটে, তবে আমিই যে ব্রহ্ম তা ভালো করে বোঝার জন্য আমাকে ব্রহ্মের বাইরে এসে তাঁর দিকে তাকাতে হয়। অনেকটা যেন ঘরের বাইরে এসে ঘরের বোধের জন্মের মত। রবীন্দ্রনাথ বললেন - ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া।’ তাই ব্রহ্ম আর আমি অভেদ বটে, তবে ভেদও আছে নিশ্চয়ই। তবে কিনা আমরা সাধারণতঃ এ বিপরীতমনস্কতা দেহজ ইন্দ্রিয়জ অনুভবে নাগাল পাই নে। তাই প্রথমেই বলা হল এ দর্শন অচিন্ত্য।

এবার এই যে আমি আলাদা হলে তাঁকে অনুভব করার জন্যই এই শক্তির স্বরূপ বটে। এই কালী,এই রাধা। তাই চৈতন্য যখন পরম ব্রহ্মকে অনুভব করার জন্যই, কেবল তাতে লীন হওয়ার জন্যই নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করছেন, তখন তিনি খুব স্বাভাবিক ভাবেই মধুর ভাবে লীলা করছেন, যা আদতেই রাধার চরিত্র, বা আরো ভালো করে বলতে গেলে শক্তির চরিত্র। শ্রীচৈতন্যের জীবন ও দর্শনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে এই মাত্র পাঁচশো বছর আগেই তিনি রাধাভাবে বেছে নিলেন শ্রীজগন্নাথকে তাঁর দয়িত রূপে। দ্বাপরের রাধাকৃষ্ণ কলিতে হলেন শ্রীজগন্নাথশ্রীচৈতন্য। অর্ধ আধুনিকমনস্করা একটু ভ্রুকুঞ্চিত হতে পারেন চৈতন্যদেবের মতো একটু পুরুষমানুষকে রাধা বলে উল্লেখ করায়। ব্যাপারটা ঠিক অমন ছেলে মেয়ের নয়। সাংখ্যে যেমন পুরুষ প্রকৃতি, এও অনেকটা তাই। আসলে সব দর্শনই শেষমেষ একই কথা বলে। সুর তাল পালটে যায় কেবল। তাই শ্রীচৈতন্য রাধাভাবে শক্তিরূপে সচল জগন্নাথ, আর শ্রীজগন্নাথ ব্রহ্মরূপে অচল জগন্নাথ, আমাদের আদরের ভাষায় ঠুঁটো জগন্নাথ।

(রথের প্রস্তুতি)

প্রান্তিকতা ও মূলস্রোতের সমন্বয়ের প্রভু জগন্নাথ

প্রান্তিকতা তথা লোকধর্মের মূল কথা সহজতা আর মূলস্রোতের চর্চার মূল দর্শন জ্ঞানচর্চা এবং আরো উন্নত জীবনযাপন। এই উন্নতির ঝোঁক পাশ্চাত্যজীবন যাত্রায় এবং তদপ্রভাবে আমাদের দেশেও মূলতঃ সামাজিক, কিন্তু আমাদের ঐতিহ্যে এ চর্চা অনেকটাই আত্মিক এবং গভীর চিন্তার ফসল। শিব, কালী ইত্যাদি ধারণা যখন মূলস্রোতে বা তৎকালীন আর্যউপাসনায় অন্তর্গত হচ্ছেন তখন যে সাংস্কৃতিক অভিযোজন (acculturation) ঘটে, শ্রীজগন্নাথের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি ন্যূনতম বলে বোধ হয়। তিনি তাঁর সমগ্র প্রান্তিক অস্তিত্ব নিয়েই বর্তমান, কালীর মত তাঁর আলাদা রূপকল্পনার দরকার পড়ে না। বৈদিক দর্শনের এ সহজতা সহজে মেনে নেওয়ার কথা নয়। শ্রীজগন্নাথের ক্ষেত্রে সংস্কৃত নবরূপকল্পনার দরকার পড়ে নি কারন তাঁর আপন মেজাজেই তিনি বৈদিক দর্শনের প্রধান প্রতিভূ হয়ে উঠতে পারেন। আমাদের মূলধারার দেবদেবীদের মূর্তিকল্পনায় যে গভীর দর্শনব্যাঞ্জনা পাওয়া যায়, জগন্নাথও তাঁর ব্যতিক্রম নন। বরং এমন সহজতম রূপে এমন গভীরতম দর্শন মানবসভ্যতার সমগ্র ইতিহাসে খুব বেশি পাওয়া যাবে না।

আদিম আর্য উপাসনা মূর্তিরহিত ছিলো। পরে সময়ের সাথে সাথে মূর্তি এসেছে, পূরাণকল্পনা এসেছে। তবে শুণ্যব্রহ্মের ধারণাটি রয়ে গেছে সবকিছুতেই। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর বা হ্লাদিনি শক্তির দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে পুরাণে, মূর্তিতে। এই বৈদিক ব্রহ্মের ধারণাটি শ্রীজগন্নাথের দর্শনের সাথে অচিন্ত্যনীয় এবং অভিন্নভাবে মিশে যায়। অবাঙমনসোগোচরের যদি রূপ সম্ভব হয় তবে তা বুঝি অমনই হতে পারে। তিনি হয়ে ওঠেন দারূব্রহ্ম। সুভদ্রা হয়ে ওঠেন হ্লাদিনী শক্তির স্বরূপ।

এইবার ভাবুন দেখি আমাদের অন্তরপুরুষ জগন্নাথরূপী ব্রহ্ম রথে করে বিহারে বেরোচ্ছেন। সেই হলো রথযাত্রা। তা জগন্নাথ যদি আমাদের অন্তরপুরুষ হন তাহলে রথটি অনিবার্যভাবে হয়ে পড়ে আমাদের দেহ। এ রথ জীবনরথ। তাঁর প্রভু রথাধিপতি শ্রীজগন্নাথ। গুপ্তিপাড়ায় রথে দেহের ইন্দ্রিয় এবং কামনা বাসনার প্রতীকস্বরূপ পুতুল দিয়ে রথ সাজানো হয়। এ জীবনের রথ টানে আপামর জনসাধারণ।
এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন -

পাঠকের মন্তব্য

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    আরো প্রতিবেদন পড়ুন

    বাংলার প্রথম বারোয়ারি – গুপ্তিপাড়া শ্রী বিন্ধ্যবাসিনী পুজোর গল্প

    জনশ্রুতি অনুসারে, হুগলির গুপ্তিপাড়ায় স্থানীয় কিছু গ্রামবাসী এক জমিদার বাড়িতে দুর্গাপুজো দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জমিদারবাড়ির লোকেরা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং পুজোমণ্ডপে প্রবেশ করতে বাধা দেয় । এই ঘটনায় অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, আর কখনও জমিদারবাড়ির পুজোয় যাবেন না, বরং নিজেরাই চাঁদা তুলে মায়ের আরাধনা করবেন। গ্রামের বারোজন যুবক এই উদ্যোগে […]

    কালীপুজো – বাংলার শক্তি উপাসনার সমন্বয়ধর্মী বিবর্তন

    আশ্বিনে দুর্গাপুজোর উৎসবের রেশ নিয়েই কার্তিকের অমাবস্যায় বাঙালী মেতে ওঠে শ্যামা মায়ের আরাধনায়। দুর্গাপুজোর মতই গৃহস্থ পরিবার থেকে শুরু করে মন্দির ও বারোয়ারি সর্বত্রই কালী পুজোর বিস্তার। দুর্গার মতোই কালীও বাংলার নিজের ঘরের মা হয়ে উঠেছেন আমাদের মানসপুজোয়। কালী প্রকৃতিগত ভাবে উগ্র, ভয়ঙ্করী এবং শ্মশানচারিণী। এই ভয়ানক রূপকল্পনা থেকে মমতাময়ী ঘরের মা কালী হয়ে ওঠার যাত্রা হিন্দুশাস্ত্র ও ইতিহাসের এক আকর্ষনীয় যাত্রা। শুধু ধর্মীয় পরিধি নয়, এই পরিবর্তনের পিছনে লুকিয়ে আছে বাংলার জীবনশৈলী, দর্শন ও সমাজের এক আশ্চর্য বিবর্তনের গল্প।

    দুর্গা পুজোর ইতিহাস ও বিবর্তন / পর্ব ২ / ধর্মীয় ও নৃতত্ববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন

    সম্পূর্ণ প্রতিবেদনের পাঠ শুনুন 00:00 1X Sorry, no results.Please try another keyword ৩/ ধর্মীয় শক্তিপুজোর দৃষ্টিকোন – বৈদিক ও পৌরাণিক মিশ্রন আমাদের জ্ঞানচর্চার একটা বড়ো মুশকিল হলো তথ্যের প্রাচুর্য কিন্তু বোধের অভাব। দুর্গা নিয়েও আমাদের ইতিহাস চর্চার মূল উদ্দেশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখি কোন পুরাণে কী গল্প লেখা আছে তাই আলোচনা। অবশ্য অন্যরকম হওয়ার কথাও নয়। […]