জনশ্রুতি অনুসারে, হুগলির গুপ্তিপাড়ায় স্থানীয় কিছু গ্রামবাসী এক জমিদার বাড়িতে দুর্গাপুজো দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জমিদারবাড়ির লোকেরা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং পুজোমণ্ডপে প্রবেশ করতে বাধা দেয় । এই ঘটনায় অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, আর কখনও জমিদারবাড়ির পুজোয় যাবেন না, বরং নিজেরাই চাঁদা তুলে মায়ের আরাধনা করবেন। গ্রামের বারোজন যুবক এই উদ্যোগে […]
একমেবাদ্বিতীয়ম শ্রী জগন্নাথ
আরো দেখবেন, জগন্নাথ কোনভাবেই যেন নিজেকে ঈশ্বর প্রমাণে সচেষ্ট নন। তিনি স্নান করে জ্বরে পড়েন। তিনি রথে চড়ে ঘুরতে বেরোন। এহ বাহ্য! তিনি ঘুরতে বেরিয়ে প্রেমিকার বাড়িতে খাবারের লোভে আটকে পড়েন। মানুষী ব্যবহারে তিনি লীলায়িত। তিনিই বোধহয় একমাত্র ঈশ্বর যিনি আজন্ম কেবল সাধারণ মানুষ হয়ে বাঁচতে চান। শ্রীজগন্নাথের এ অপরূপ দর্শনের শিকড় খুঁজতে গেলে অনেকটি বিষয় আলোচনা করতে হয়। যার মধ্যে সমাজবিজ্ঞান তথা নৃতত্ববিজ্ঞান ধর্মতত্বের আগে চলে আসে বলে আমার বিশ্বাস। প্রচলিত পুরাণ যেখানে দেবদেবীদের রূপকথাধর্মী অলৌকিকত্বের মাধ্যমে সাধারণের বিশ্বাস অর্জন করতে চেয়েছে বা ধারণাবিস্তার করতে চেয়েছে, জগন্নাথ সেখানে স্বতন্ত্রভাবে তাঁর নিজস্বতা বজায় রেখেছেন সাধারণ মানুষী লীলাবিস্তারের মাধ্যমে।
জগন্নাথের আর একটি বিশেষ দিক তাঁর রাজসিক প্রজাপালক দর্শন। তিনি সাধারণ মানুষের মতো হলেও রাজা বটে। তাঁর রান্না এক পাত্রে দুবার হয় না। তাঁর ভোগে পদ হয় ছাপ্পান্ন রকম। এক রথে তিনি দুবার চড়েন না। পঁচিশ তিরিশ রকম তাঁর সাজ। প্রায় সমস্ত আচারেই রাজকীয়তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে। কিন্তু দেখুন এই রাজা কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর মূর্তি নির্মান হয় দারূ অর্থাৎ কাঠ দিয়ে। ভোগ রান্না হয় মাটির পাত্রে, কাঠের জ্বালে। কাঠের রথে তিনি যাত্রা করেন।
এবং অবশ্যই রথযাত্রা। অন্যান্য দেব দেবীরা মন্দিরে অবস্থান করেন। ভক্তেরা দেবদর্শনে মন্দিরে যান। শ্রীজগন্নাথ নিজেই রথযাত্রায় মন্দির ছেড়ে ভক্তদর্শনে বের হন। রথযাত্রা তাঁর রাজধর্মের সঙ্গে যেমন মানানসই, তেমনই উপযুক্ত তাঁর ভক্তবৎসল দর্শনের। বাংলার মাটিতে এমন দেবতা বিরল যিনি ভক্তের সঙ্গে মিলনের উদ্দেশ্যে নিজেই মন্দির ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন।
(রথের প্রস্তুতি)
শ্রীজগন্নাথের বিবর্তনবিমূখতা
আগম পথে শাক্ত, শৈব বা বৈষ্ণব যে তিনটি মূল পথ - তার মধ্যে শ্রীজগন্নাথ বৈষ্ণবমার্গের অন্তর্গত হয়েছেন। তবে কৃষ্ণ বা বিষ্ণুর মূলধারার উপাসনার এক্কেবারে পাশাপাশি থেকেও জগন্নাথস্যর নিজের স্বতন্ত্রতা বিশেষভাবে তাঁর আদিম টোটেম রূপ এবং সে সংক্রান্ত আচার যথাযোগ্যভাবে বজায় রেখেছেন চিরকাল। যদিও সংস্কৃত শিক্ষিতরা এই দিকটিকে স্বীকার করবেন না তাদের স্বার্থেই।
জগন্নাথের এই বিবর্তনবিমূখতা আমাদের এক গভীর আর্থসামাজিক প্রবণতাকে নির্দেশ করে। হয়তো সার্বিক পৃথিবীর সমস্ত সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই একই কথা খাটে, তবু আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় বাংলার কথাই বুঝি। আমাদের সংস্কৃতির একদিন ছিলো রাজতন্ত্র। তারপর আমরা গনতন্ত্রে এসেছি। এই পরিবর্তন খানা আমরা কেবল একরকম পরিপ্রেক্ষিতেই দেখি। একনায়কতন্ত্র থেকে সাধারণতন্ত্রে উন্নয়ন হিসেবে। যদিও আদতে পরিবর্তনখানা একেবারেই তেমন নয়। আমি বুঝি ঘোষিত একনায়কতন্ত্র থেকে অঘোষিত ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর রাজতন্ত্র। বলা যায় একটু বিবর্ধিত একনায়কতন্ত্র। এই সত্যটুকু আমরা বুঝিনে বা স্বীকার করি নে। ফলে অনেক সহজ কথা জটিলভাবে বুঝতে হয় আর কি। রাজতন্ত্রের সময় সামাজিক বিভাগ অনেকটা সরল ছিলো অবশ্যই। রাজা মূলতঃ করব্যবস্থার দিকে মনোযোগী ছিলেন। প্রজাপালন তার মূল কাজ হলেও সম্পর্কটা আদতে ছিলো করকেন্দ্রিক। অনেক রাজাই প্রজাবৎসল ছিলেন বটে, কিন্তু আসল কথা হল প্রজা তেমন রাজা নির্ভরশীল ছিলো না। ফলে বিশেষ পরিস্থিতি বা ব্যতিক্রম ছাড়া রাজা উপযাজক হয়ে প্রজাসংস্কৃতিতে তেমন অনুপ্রবেশ করতেন না। অন্ততঃ গ্রামবাংলা স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে নিজেদের প্রয়োজন নিজেই মিটিয়ে নিতে পারতো। এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আজকের দিনের তুলনায় অনেকটাই বেশি ছিলো বাংলায়। বাংলার অসীম প্রাকৃতিক সম্পদ এর অন্যতম কারন অবশ্যই।
আজকের বাংলার সংস্কৃতিতে প্রধান দুই ধারা - লোকসংস্কৃতি এবং নগরসংস্কৃতি। রাজতন্ত্রের সময়েও ব্যাপারটা খানিক এমনই ছিলো, কেবল নগরপ্রাধান্য এমন ঘোরতরভাবে আগ্রাসী হয়ে ওঠেনি। জগন্নাথে দর্শনের স্বরূপ বোঝার আগে এই দুই সংস্কৃতির ভিত্তিমূলক চরিত্রবিশ্লেষণ প্রয়োজন। বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অসামান্য গুণ হলো এর তৃণচরিত্র। এর মৃত্যু নেই। পরিবর্তন নেই। আমরা যারা গেল গেল রব তুলি তা নগরসংস্কৃতির আলোচ্যবিষয় হতে পারে, বৃহত্তর লোকসংস্কৃতি অক্ষয়, অক্ষর।
‘শক, হুণ দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন’- এ ভারত আত্মার স্বভাব। প্রচুর আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়েও লোকসংস্কৃতি তার মূলভাবটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। লোকের এ এক অলৌকিক স্বভাব। নগরসংস্কৃতির চরিত্র ঠিক এর উল্টো। সে নতুনকে সর্বদাই আগ্রহসহকারে গ্রহণ করে। সে বিশ্বনাগরিক হতে চায়। নতুনকে পরখ করে দেখতে চায় নিজের জীবনে। অপরদিকে লোক নিজের বৃত্তে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে চায়। তার কাছে নতুনের হাতছানি, বৃহতের আকর্ষণ তেমন জোরালো নয়। আমরা নাগরিক ‘শিক্ষিত’ মানসিকতায় এ কারনেই গ্রামকে রক্ষণশীল অনুন্নত, এবং শহরকে আধুনিক উন্নত ভেবে থাকি। আধুনিক কুপমণ্ডূক শিক্ষা এর বাইরে আমাদের ভাবতে শেখায়নি কোনদিন। জগন্নাথ দর্শন এই আধুনিক শিক্ষিতদের জন্য ব্রহ্মের এক নির্মম পরিহাস। আধুনিক নগরসভ্যতায় শিক্ষিত মানুষ যখন জগন্নাথপ্রীতি প্রকাশ করেন, আমার বেদম হাসি পায়। এই এক জায়গায় এসে ‘শিক্ষিত বড়োলোক’-দের জ্ঞানত বা অজ্ঞানতঃ ছোটলোকদের প্রাধান্য দিতে হয়ই। সমস্ত দেবদেবীর মধ্যে একমাত্র জগন্নাথই তাঁর শিকড়বিস্মৃত নন। আজও তাই জগন্নাথের সেবায় শবরদের অধিকার সুনিশ্চিত। আজও জগন্নাথের সমস্ত লীলায় লৌকিকত্বের আধিক্য। একমাত্রই জগন্নাথই সমাজের সমস্ত স্তরে তাঁর লোকসত্বা নিয়ে স্বরূপে বর্তমান। আধুনিক নগরসভ্যতা বোঝেও নি কখন তারা জগন্নাথের অদৃশ্য হাত ধরে লোকসংস্কৃতির অঙ্গনে গিয়ে পড়েছেন। আধুনিক শিক্ষিত বাঙালীরা নিশ্চয়ই রণজিৎ গুহ, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তথা সমাজবিজ্ঞানের ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ নামক শাখাটি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন। এ তত্বে ‘অ্যাফার্মেটিভ সাবোতাজ’ বলে একটি প্রকল্প আছে। আমি দেখতে পাই শ্রীজগন্নাথ তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শ্রীরামচন্দ্র বাঁদরের সাহায্য নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু বাঙালি বাঁদর চেনেনি। শ্রীজগন্নাথ গাছ, মাটি আর বাঁদর শ্রণির প্রান্তিক মানুষগুলোকে এমন মর্য্যাদা দিলেন যে জগন্নাথের পরিসরে তাদের আর কিছুতেই অগ্রাহ্য করা গেল না আজও।
সচল ও অচল জগন্নাথ
এবার এই যে আমি আলাদা হলে তাঁকে অনুভব করার জন্যই এই শক্তির স্বরূপ বটে। এই কালী,এই রাধা। তাই চৈতন্য যখন পরম ব্রহ্মকে অনুভব করার জন্যই, কেবল তাতে লীন হওয়ার জন্যই নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করছেন, তখন তিনি খুব স্বাভাবিক ভাবেই মধুর ভাবে লীলা করছেন, যা আদতেই রাধার চরিত্র, বা আরো ভালো করে বলতে গেলে শক্তির চরিত্র। শ্রীচৈতন্যের জীবন ও দর্শনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে এই মাত্র পাঁচশো বছর আগেই তিনি রাধাভাবে বেছে নিলেন শ্রীজগন্নাথকে তাঁর দয়িত রূপে। দ্বাপরের রাধাকৃষ্ণ কলিতে হলেন শ্রীজগন্নাথশ্রীচৈতন্য। অর্ধ আধুনিকমনস্করা একটু ভ্রুকুঞ্চিত হতে পারেন চৈতন্যদেবের মতো একটু পুরুষমানুষকে রাধা বলে উল্লেখ করায়। ব্যাপারটা ঠিক অমন ছেলে মেয়ের নয়। সাংখ্যে যেমন পুরুষ প্রকৃতি, এও অনেকটা তাই। আসলে সব দর্শনই শেষমেষ একই কথা বলে। সুর তাল পালটে যায় কেবল। তাই শ্রীচৈতন্য রাধাভাবে শক্তিরূপে সচল জগন্নাথ, আর শ্রীজগন্নাথ ব্রহ্মরূপে অচল জগন্নাথ, আমাদের আদরের ভাষায় ঠুঁটো জগন্নাথ।
(রথের প্রস্তুতি)
প্রান্তিকতা ও মূলস্রোতের সমন্বয়ের প্রভু জগন্নাথ
আদিম আর্য উপাসনা মূর্তিরহিত ছিলো। পরে সময়ের সাথে সাথে মূর্তি এসেছে, পূরাণকল্পনা এসেছে। তবে শুণ্যব্রহ্মের ধারণাটি রয়ে গেছে সবকিছুতেই। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর বা হ্লাদিনি শক্তির দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে পুরাণে, মূর্তিতে। এই বৈদিক ব্রহ্মের ধারণাটি শ্রীজগন্নাথের দর্শনের সাথে অচিন্ত্যনীয় এবং অভিন্নভাবে মিশে যায়। অবাঙমনসোগোচরের যদি রূপ সম্ভব হয় তবে তা বুঝি অমনই হতে পারে। তিনি হয়ে ওঠেন দারূব্রহ্ম। সুভদ্রা হয়ে ওঠেন হ্লাদিনী শক্তির স্বরূপ।
এইবার ভাবুন দেখি আমাদের অন্তরপুরুষ জগন্নাথরূপী ব্রহ্ম রথে করে বিহারে বেরোচ্ছেন। সেই হলো রথযাত্রা। তা জগন্নাথ যদি আমাদের অন্তরপুরুষ হন তাহলে রথটি অনিবার্যভাবে হয়ে পড়ে আমাদের দেহ। এ রথ জীবনরথ। তাঁর প্রভু রথাধিপতি শ্রীজগন্নাথ। গুপ্তিপাড়ায় রথে দেহের ইন্দ্রিয় এবং কামনা বাসনার প্রতীকস্বরূপ পুতুল দিয়ে রথ সাজানো হয়। এ জীবনের রথ টানে আপামর জনসাধারণ।
















