00:00
1X
Sorry, no results.
Please try another keyword

আমাদের জ্ঞানচর্চার একটা বড়ো মুশকিল হলো তথ্যের প্রাচুর্য কিন্তু বোধের অভাব। দুর্গা নিয়েও আমাদের ইতিহাস চর্চার মূল উদ্দেশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখি কোন পুরাণে কী গল্প লেখা আছে তাই আলোচনা। অবশ্য অন্যরকম হওয়ার কথাও নয়। বর্তমান কালের ভাবনার গভীরতাহীনতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এ সমস্যা আজকের নয়। বরং বলা যায় পুরাণের উৎপত্তির একটা কারন অবশ্যই কালের সঙ্গে মেধা ও বোধের ক্রমাগতঃ কমে যাওয়া। ভারতীয় ছয়খানা প্রধান দর্শনে মূর্তি সেভাবে কিছু নাই। সে সবই দার্শনিক আলোচনা। যেমন ধরুন সাংখ্য, যোগ বা বেদান্ত দর্শনের উপনিষদ। এর মধ্যে গল্প আছে প্রচুর, বিভিন্ন চরিত্র আছে। কিন্তু সেই গল্প বা চরিত্র দের প্রয়োজন কেবল দার্শনিক তত্বগুলি সরাসরি আলোচনার জন্য। অনেকসময়েই এই আলোচনা দুটি চরিত্রের মধ্যে প্রশ্ন এবং উত্তরের ভঙ্গিতে রচিত। অন্যদিকে পুরাণে গল্পটিই প্রধান, গল্পের পেছনে রূপকের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তত্ব। সাধারণের মধ্যে গভীর দার্শনিক ভাবনা বিকাশের প্রধান মাধ্যম পুরাণ। পুরাণের গল্পগুলির মাধ্যমে আমাদের যাতে দর্শনের গভীর তত্ব বুঝতে সুবিধে হয় এই জন্যই মূলতঃ বেদ পরবর্তী যুগে পুরাণ লেখা হয়। ফলতঃ ভারতীয় দর্শন বা বেদ-উপনিষদ থেকে পুরাণ কেন আলাদা এই পার্থক্যটা পরিস্কার না হলে দুর্গাপুজোর মত বেদ-পুরাণ মিশ্রিত এবং যুগ যুগ ধরে বিবর্তিত একটি অনবদ্য পুজোর বিস্তারটি বোঝা সহজ হবে না।
বৈদিক দর্শনে কোন পৌরাণিক চরিত্রকে খুঁজে বের করতে চাওয়া একপ্রকার আরোপিত মিল খুঁজে বার করার চেষ্টা। বৈদিক দর্শনে উপাসনা করা হয়েছে শক্তির। এবং সে উপাসনার ধরণ ঠিক আমাদের চেনা কালীপুজো বা শাক্ত ধরণের নয়। বাংলার শাক্ত উপাসনা বরং অনেকটা বৌদ্ধ শাক্ত উপাসনার সঙ্গে মিলতে পারে। বাংলার দুর্গাপুজো বৈদিক আর্য শক্তি উপাসনার সঙ্গে শাক্ত তন্ত্রের এক অনিবর্চনীয় মিশ্র উপাসনা পদ্ধতি। শুধু তাই নয়, যে সময় দুর্গাপুজোর প্রচলন সামাজিকভাবে বাড়লো (ষোড়শ শতক), সে সময় বাংলা বৈষ্ণব উপাসনায় ভেসে যাচ্ছে। ফলে দুর্গাপুজোতেও বৈদিক এবং শাক্ত পদ্ধতির সঙ্গে বৈষ্ণব পদ্ধতিও যুক্ত হলো।
ভারতীয় দর্শন ও উপাসনা পদ্ধতিতে নিগম ও আগম এই দুই প্রধান বিভাগ। আমরা প্রচলিত অর্থে এই দুই বিভাগকে ধ্রুপদী এবং লোকায়ত উপাসনা পদ্ধতি ভাবতে পারি। বৈদিক উপাসনা মূলতঃ ধ্রুপদী উপাসনা। ধ্রুপদী উপাসনা চেতনার তিনরকম বৃত্তির উপর নির্ধারিত। বুদ্ধিবৃত্তি, হৃদয়বৃত্তি, সংকল্পবৃত্তি। এই তিন বৃত্তি থেকে জ্ঞান, ভক্তি ও কর্ম যোগের উৎপত্তি। ভারতীয় দর্শন – সাংখ্য থেকে শুরু করে বেদ, উপনিষদ ইত্যাদি ধ্রুপদী উপাসনা পদ্ধতি এই তিন যোগের পথ। এ হল নিগম পথ।
অন্যদিকে রয়েছে বাংলার লোকায়ত উপাসনা পদ্ধতি। একে বলে আগম পথ। বা প্রচলিত অর্থে তন্ত্রশাস্ত্র বলা যায়। যদিও তন্ত্রশাস্ত্র বিশেষতঃ শাক্তউপাসনা। তবে তন্ত্র বৃহত্তর অর্থে আগম পথকেও বোঝায়। আগম পথ মূলতঃ তিনটি। শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব। শিব, কালী এবং বিষ্ণু বা হরি এই তিনপথের উপাস্য দেবদেবী। এখানে নিশ্চই বোঝা যাচ্ছে শিব, কালী বা নারায়ণ বৈদিক ধ্রুপদ দেবদেবী নন। অবশ্য তার মানে এই নয় যে ধ্রুপদী উপাসনায় এই তিন পথের ধারণা নেই। যেমন বৈদিক রুদ্রদেব অনেকাংশেই শিবের মত দেবতা। আবার বৈদিক শক্তির ধারণা আর লোকায়ত কালীর ধারণার মধ্যেও কিছু আলাদা নেই তেমন।
ঠিক এই জায়গায় পুরাণ একরকম সেতুনির্মানের কাজ করে। পৌরাণিক উপাখ্যানের মধ্যে ধ্রুপদী জ্ঞান এবং লোকায়ত ভক্তি মিলেমিশে এক হয়ে যায়। অসংখ্য দেবদেবী, দৈত্য অসুর এমনকি পশুপাখি গাছপালা পাহাড় পর্বতও সে উপাখ্যানের চরিত্র হয়ে ওঠে। তারপর লোকমুখেই যুগে যুগে প্রচারিত হতে থাকে। দেবদেবীরা পুজিত হতে থাকেন নতুন নতুন রূপে। সাংখ্য, যোগ বা বৈদিক দর্শনের মূল ভাবগুলো লোকায়ত গল্পের মধ্যে রূপকের আকারে গাঁথা হয়ে যায়।
এই সময়ে এসে প্রচলিত উপাসনায় বৈদিক ধ্রুপদ স্বরূপ আর নেই। মূলতঃ পৌরাণিক উপাখ্যানই আমাদের উপাসনার উৎস হয়ে উঠেছে অনেকদিনই। ফলে আজ আর বৈদিক ধ্রুপদী উপাসনা এবং লোকায়ত উপাসনার মধ্যে তেমন ফারাক করা যায় না। শিব, কালী এবং বিষ্ণু তিন দেবতাই আজকে মূলধারার উপাসনায় মিশে গেছেন। এবং এই অপূর্ব মেলবন্ধনে শিব আর বিষ্ণু হয়ে উঠেছেন ধ্রুপদী ব্রহ্মের সমার্থক আর কালী হয়ে উঠেছেন বৈদিক শক্তির প্রতীক। সাংখ্যের পুরুষ আর প্রকৃতির তত্ব শিব এবং কালীর মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে।
দুর্গাও এর ব্যতিক্রম নন। বরং বলা যায় দুর্গাপুজোতেই এই দুইরকম উপাসনা পদ্ধতির মিলমিশ আরো ভালো ভাবে বোঝা যায়। উপরন্তু বাংলার শাক্ত উপাসনার প্রতি চিরকালীন ঝোঁক এই দুর্গাপুজোকে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছে। বৈদিক শক্তির ধারণার সঙ্গে তান্ত্রিক শক্তির ধারণা মিশে গেছে দুর্গাপুজোয়।
লোকায়ত পুজোর ভাব মেশার ফলেই দুর্গাপুজো সবার জন্য অবারিত হয়েছে। বৈদিক ধারণায় শক্তিকে ঊমা বা হৈমবতী এমনকি সরস্বতী বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্গা প্রসিদ্ধ হয়েছেন পৌরাণিক সময়ে। ঐতিহাসিক কালের হিসেবে বেদ এবং পুরাণ রচনায় সময়ের পার্থক্য হাজার বছরের ওপরে। সে হিসেবে দুর্গার জন্ম সরস্বতীয় হাজার বছর পরে। অথচ আমরা বাংলায় সরস্বতীকে দুর্গার কন্যা বলে জানি। এই গোলমালে মাথা ঘামাবার বিশেষ কিছু নেই। পুরাণে বৈদিক ধারণাগুলিই পুণর্নিমিত হয়। এবং গল্পের আকারে আসার জন্যেই ধারণাগুলি কিছু কিছু অন্যরূপ ধারণ করে। এমন আরো বহু উদাহরণ দেখা যায় যা সচরাচর আমরা অজ্ঞাতসারেই খেয়াল করি না। কিন্তু কোন গভীর ধারণাকে সহজভাবে নবনির্মান করলে কিছু এমন স্ববিরোধী বিভিন্নতা থাকেই। বিশেষ করে পুরাণের সংখ্যা এবং আয়তন বিচার করলে আমাদের দেবদেবীদের জন্ম এবং জীবনের কাহিনীর বিচিত্রতা এবং বিভিন্নতা খুবই স্বাভাবিক মনে হয়।
দুর্গার পৌরাণিকভাবে গড়ে ওঠাও এই পথ ধরেই। দুর্গাপুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত চণ্ডী মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ। চণ্ডীতে আমরা শক্তির বিভিন্ন রূপ দেখতে পাই। কালী, চামুণ্ডা, কৌষিকী এবং দুর্গা যার অন্যতম। শক্তির এই বিভিন্ন রূপ মহাপরাক্রমশালী অসুরসেনাকে পরাস্ত ও বধ করেন। চণ্ড, মুণ্ড, মধু, কৈটভ, শুম্ভ, নিশুম্ভ এবং দলনেতা মহিষাসুর এদের মধ্যে অন্যতম।
দুর্গাপুজোর উৎস বিভিন্ন পুরাণে নানাপ্রকার। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে প্রথম দুর্গাপুজো করেন কৃষ্ণ, তারপর ব্রহ্মা, শিব এবং ইন্দ্র দুর্গার আরাধনা করেছেন। এর মধ্যে ব্রহ্মা মধু-কৈটভ বধের জন্য দুর্গাকে আবাহন করেন। এইটিই আমাদের দুর্গাপুজোর প্রধান পৌরাণিক উপাখ্যান। মার্কণ্ডেয় পুরাণে এই কাহিনীটি সুরথ রাজার প্রশ্নের উত্তরে আসছে। আবার অকালবোধনের প্রসঙ্গে জড়িয়ে আছে রামের দুর্গাপুজোর কাহিনী, যে সময়কাল ধরে আমরা আজ শরৎকালে দুর্গাপুজো করি। পৌরাণিক কাল পেরিয়ে এসে কৃত্তিবাসী রামায়ণে আমরা রামের দুর্গাপুজোর বিশেষ উল্লেখ পাই এবং সে সময় থেকেই সম্ভবতঃ শরৎকালীন দুর্গাপুজো জনপ্রিয়তা লাভ করে।
কাহিনীর ঘনঘটা এবং উৎস ও সময়ের কূটতর্ক পেরিয়ে আমরা বরং দেখতে চেষ্টা করি ধ্রুপদী, বৈদিক নিগম বা সনাতনী ধারণায় শক্তি উপাসনা কীভাবে দুর্গাপুজোয় আগম শাক্ত উপাসনায় মিলে গেল। বৈদিক ধারণায় শক্তি প্রকৃতিরই অন্য নাম। সাংখ্য দর্শনের পুরুষ-প্রকৃতি তত্বে পুরুষ হলেন নিরাকার, নির্গুণ ব্রহ্ম। আর প্রকৃতি হল হ্লাদিনী শক্তি। সাংখ্য, যোগ বা বৈদিক দর্শনে এই শক্তিকে বলা হয় মহামায়া বা যোগমায়া। উল্লেখ্য মার্কণ্ডেয় পুরাণেও মার্কণ্ডেয় ঋষি রাজা সুরথকে বলছেন এই শক্তির নাম মহামায়া। এইটিই বৈদিক যোগসূত্র। বৈদান্তিক মায়াবাদ থেকেই এই ধারণার উৎপত্তি। বেদের মধ্যে দুর্গার নামোল্লেখ খোঁজার চেয়ে এইটিই সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ হতে পারে যে দুর্গা বৈদিক ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন দেবী নন। যদিও বৈদান্তিক মায়াবাদের ‘ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা’ এই ধারণাটি আর দুর্গায় এসে তেমন প্রবল নয়। কারন দুর্গার মধ্যে মিশে গেছে লোকায়ত উপাসনা। ফলে বৈদিক উপাসনার স্বরূপ উপাসনার বদলে সম্পদ এবং প্রতীক উপাসনা দুর্গাপুজোর মধ্যে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।
বাংলায় এসে দুর্গার সাথে যোগ হয়েছে বিবাহিত মেয়ের বাপের বাড়ি ফেরার আবেগঘন ভক্তি। শাক্তভক্তির রীতি অনুযায়ীই দেবী দুর্গা হয়ে উঠেছেন ঘরের মেয়ে। তিনি চারদিন চার ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসেন। সারা বছর তাই বাংলা উদ্বেল অপেক্ষা করে মেয়ের বাড়ি ফেরার।
বাংলায় সংস্কৃতি বা ইতিহাস আলোচনার একটা মূল সমস্যা হচ্ছে ধর্মীয় প্রভাব। ধর্মীয় দৃষ্টিকোন বাদ দিয়ে সামাজবিজ্ঞান বা নৃতত্ববিজ্ঞানের দিক থেকে সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কথা উঠলে আমাদের ভক্তিতে আঘাত লাগে। দেবী দুর্গা বা অসুরকে সামাজিক প্রতিনিধি ভাবতে বাংলার মানুষজনদের অসুবিধে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তার ওপর প্রকৃত মুক্তচিন্তাও এ যুগে বিরল। ফলে ভক্তিবাদের ওপর পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও তাকে সামাজিক জীবনশৈলী হিসেবে দেখার মত মুক্তচিন্তক এ সময়ে বিরল। এ সময়ের ব্রাহ্মণরাও পৌরাণিকতায় আচ্ছন্ন। বৈদিক ধারণার অপরিসীমত্ব কে ধারণ করবার মত মেধা ও গভীরতা এ যুগে বিরল। সাংখ্য, যোগ বা ন্যায়শাস্ত্রের মত যুক্তিপূর্ণ আলোচনার অভ্যাসও আমাদের আর নাই। আধুনিক নৃতত্ববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোনটি তাই আজকের আধাভক্তের কাছে সর্বদাই বর্জনীয়। ঠিক যেমন আধাআধুনিক মানসিকতার নব্যবাঙালীদের কাছে ভক্তিবাদ ব্যাপারটিও প্রায় কুসংস্কার গোছের মনে হয়।
প্রকৃত মুক্তভাবনার অভ্যেস না থাকলে পাঠকের এই নৃতত্ববিজ্ঞানের অংশটি এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
প্রতিটা ধর্মকেই যদি একপ্রকার জাতিগত জীবনশৈলী হিসেবে দেখা যায়, যদি ধর্মের গভীর তত্বগুলিকে সরিয়ে রেখে তাকে কেবল জড়বিজ্ঞানের আঙ্গিক থেকে দেখা হয় তাহলে কতগুলো নতুন দিক ফুটে ওঠে। যা আদতে প্রকৃত সন্ধানীকে নতুন বেশ কিছু ভাবনার সূত্র দিতে পারে।
ভারতীয় হিন্দু ধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি তা আসলে ভারতের ভৌগলিক চরিত্রের মতই বিভিন্নতায় পরিপূর্ণ। মূলতঃ আর্যদের প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলিই হিন্দুধর্মে প্রধাণ বলে বিবেচিত হয়। তবে আর্যদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে আর্যধর্ম সময়ের সাথে সাথে অনার্য ধর্মের সাথে মিলেমিশে গেছে। তাতে বেশ কিছু ধারণা অপরিবর্তিত থেকে গেছে, কিছু আমূল বদলে গেছে। কখনো আবার আর্যদের নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই ভাঙন ধরেছে এবং নতুন গোষ্ঠী পুরনো ধারণা বর্জন করেছে বা পালটে নিয়েছে।
অসুর শব্দটার ইতিহাসও অনেকটা ঐরকম। ঋক্বেদে দেখা যায় ইন্দ্র, বরুন সহ বহুদেবতাকে অসুর বলে সম্বোধন করা হয়েছে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনলেন। ঋক্বেদের প্রথম দিকে ‘অসুর’ শব্দটি প্রসংশনীয় এবং শ্রদ্ধাসূচক অর্থে ব্যবহার হতো। ঋক্বেদের ২য় মণ্ডলেই বরুনকে সম্বোধন করা হয়েছে অসুর বলে।
ত্বং বিশ্বেষাং বরুণাসি রাজা যে চ দেবা অসুর যে চ মর্তাঃ।
শতং নো রাস্ব শরদো বিচক্ষেহশ্যামায়ংষি সুধিতানি পূর্বাঃ।।
~ ঋক্বেদ, ২। ২৭। ১০
হে অসুর বরুণ! তুমি, দেবতাই হও বা মানুষই হও, তুমি সকলের রাজা। আমাদের শতবর্ষ অবলোকন করতে দাও যেন আমরা প্রাচীনদের উপভুক্ত আয়ু লাভ করতে পারি।
~ রমেশ চন্দ্র দত্ত , ঋগ্বেদ সংহিতা (প্রথম খণ্ড), পৃষ্ঠা – ৩৬৮-৩৬৯
এই শ্লোক থেকে পরিস্কার হয় একসময় অসুর নিন্দনীয় অর্থে প্রয়োগ হত না। পরবর্তীকালে আরণ্যক অংশে এসে অসুর নিন্দনীয় হয়ে ওঠে।
নৃতত্ববিজ্ঞানের হিসাবে আর্যদের ইতিহাস প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০ সালেরও আগের। বেদের লিখিত রূপের আনুমানিক কাল ঐরকমই। ধরা যায় এরও আগে বেদের শ্রুতি বা মৌখিক রূপ প্রচলিত ছিল। আর্যরা নৃতত্ববিজ্ঞানে ‘আলপাইন’ ও ‘নর্ডিক’ গোষ্ঠীর মানুষ। এদের মধ্যে ‘নর্ডিক’ আর্যদেরই আমরা বৈদিক আর্য বলে মানি। অন্যদিকে যদি বাংলার কথা ভাবি – বাংলার নৃতাত্বিক পরিচয় ‘অস্ট্রিক’ গোষ্ঠী হিসাবে। বাংলার আদিম জনগোষ্ঠী অবশ্যই ‘আর্য’ ছিলেন না। অস্ট্রিক পরিচয়ের সঙ্গে বাংলা ক্রমে দ্রাবিড় এবং মোঙ্গোল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশেছে। আর্যরা যখন ভারতে প্রবলভাবে বিস্তার লাভ করছেন তখন ভারতে অনার্য বলতে মূলতঃ এই অস্ট্রিক, দ্রাবিড় এবং মোঙ্গল জাতি বোঝাতো।
ঐতিহাসিকদের মতে আর্যগোষ্ঠীর মধ্যেই প্রবল বিবাদ ঘটে খীষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের আশপাশ নাগাদ। সে সময় আর্যসংস্কৃতিতে দেবতা ও অসুর সমার্থক। এই বিবাদ মূলতঃ উপাসনা এবং অন্যান্য বিশ্বাস নিয়েই। এই দুই গোষ্ঠীর উপাস্য প্রধান হয়ে ওঠেন ইন্দ্র এবং বরুন। বরুন উপাসকেরা এই বিবাদে পিছু হঠেন এবং বর্তমান ইরান অঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য হন। এরা হলেন ‘আলপাইন’ গোষ্ঠী। যদিও অনেকের মতে ইরান অঞ্চলের আর্যরা প্রথম থেকেই ইরানেই বসতি গড়ে তোলেন। তবে আসল কথা হলো এই ‘আলপাইন’ গোষ্ঠীর আরাধ্য হয়ে ওঠেন অসুর। অন্যদিকে ‘নর্ডিক’ গোষ্ঠীর আরাধ্য হন দেবতা। এই অসুরপূজক গোষ্ঠীর মূল সভ্যতা গড়ে ওঠে আসিরিয়া অঞ্চলে। আসিরিয়া অঞ্চলে অসুর পুজিত হতে থাকেন। আর নর্ডিক গোষ্ঠী ভারতে প্রাধান্য বিস্তার করে। তাদের উপাস্য হন দেবতা। এই বিভাজনের পর থেকেই ‘অসুর’ শব্দটা নর্ডিক গোষ্ঠীর কাছে নিন্দনীয় হয়ে ওঠে। এবং সেই যুক্তিতেই অস্ট্রিক, দ্রাবিড় এবং মোঙ্গোল গোষ্ঠীর অনার্যরাও নর্ডিক বা ভারতীয় আর্যদের কাছে অসুর বলে নিন্দিত হতে থাকে। আর্য ও অনার্যদের জীবনযাত্রাতেও ফারাক ছিলো বিস্তর। আর্যরা ব্রহ্মউপাসক। অন্যদিকে অনার্যরা মাতৃউপাসক। আর্যরা পশুপালনে দক্ষ, অনার্যরা চাষবাসে দক্ষ। আর্যরা ঘোড়া ব্যবহারে দক্ষ। অনার্যরা হাতি ব্যবহারে দক্ষ। আর্যসংস্কৃতি বীজপ্রাধান্যে গঠিত। অনার্যসংস্কৃতি ক্ষেত্রপ্রাধান্যে গঠিত।
এইখানে মনে রাখা দরকার, বাংলা তথা পূর্বভারতের একটি প্রধান এবং অতীত বিশেষত্ব হলো এই অঞ্চল কখনোই নিজ সংস্কৃতি ভুলে অন্য সংস্কৃতির কাছে মাথা নোয়ায়নি। সে আর্য হোক বা আলেকজাণ্ডার। এমনকি ইংরেজ রাজত্বেও পূর্বভারত এবং বাংলা প্রতিবাদের মূল কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে আমরা সে প্রবল ঐতিহ্য প্রায় সবটাই ভুলতে বসেছি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও আমরা ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার ভুত কাটিয়ে উঠতে পারছি না। প্রাচীন আর্যরা ঔপনিবেশিক ছিলেন না। তা সত্বেও বাংলা এই সংস্কৃতি মুখ বুজে গ্রহণ করেনি। বরং নিজের আদিম ঋদ্ধ সংস্কৃতি দিয়ে পূর্ণ করেছে আর্যসভ্যতাকে।
একাধিক জাতির জীবনশৈলী এবং ধারণার মিশ্রন খুব সোজা বিষয় নয়। প্রাথমিক বিরোধ বিবাদ অতিক্রম করে ভারতের সুবিশাল ঐতিহ্য ক্রমে আর্য ও অনার্য শৈলীকে মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়েছে। আর্যরা প্রকৃতি শিখেছেন অনার্যদের কাছে। অনার্যরা অপ্রাকৃত শিখেছেন আর্যদের বোধ থেকে। ব্রহ্মপ্রধান আর্যসংস্কৃতিতে শক্তিআরাধনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অনার্যগোষ্ঠী বৈদিক যজ্ঞকে আপন করে নিয়েছে তাদের উপাসনায়। আর্যরা বহিরাগত হয়ে ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেননি। বরং ভারতবর্ষই তাদের নিজেদের দেশ হয়েছে। অনার্যরাও তাদের ভাবনার গভীরতা স্বীকার নিয়েছেন। যেমন আর্যরা স্বীকার করেছেন অনার্যদের কর্মক্ষমতা এবং দৈহিক শক্তির প্রাবল্যকে।
নৃতত্ববিজ্ঞানের আঙ্গিকে দুর্গাপুজোকে দেখলে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির এই মিলন অপূর্ব সুন্দর ভাবে ধরা দেয়। পৌরাণিক কাহিনীও এই দিকেই নির্দেশ করে। খেয়াল করে দেখুন মহিষাসুরের গল্পটাই। মহিষাসুরের বাবা রম্ভাসুর ও কাকা করম্ভাসুর তপস্যা করছিলেন। রম্ভাসুর আগুনের মধ্যে এবং করম্ভাসুর জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে। বুঝতে অসুবিধে হয় না তারা অগ্নি এবং বরুন এই দুই দেবতার উপাসনা করছিলেন। অর্থাৎ তারা দুই আর্যদেবতার উপাসনা করছেন। তা ইন্দ্র হঠাৎ তপস্যার তেজ দেখে ভয় টয় পেয়ে কুমীর সেজে করম্ভাসুরকে মেরে ফেললেন। রম্ভাসুর কোনক্রমে পালিয়ে বাঁচলেন। রম্ভাসুরের ছেলে মহিষাসুর প্রতিশোধ নিতে মনস্থ করলেন। তার জন্য প্রথমেই তিনি আবার এক আর্যদেবতার পুজো শুরু করলেন। তিনি হলেন ব্রহ্মা। মহিষাসুরের উদ্দেশ্য অমরত্বলাভ। ব্রহ্মাকে তপস্যার জোরে বর দিতে আসতেই হলো। অমরত্ব দিতে রাজি না হওয়ায় মহিষাসুর বর চাইলেন কোন পুরুষ যাতে তাকে হত্যা না করতে পারে। আমরা প্রায়শঃই এই সিদ্ধান্তে মহিলাদের প্রতি অবহেলা দেখি। কিন্তু ভেবে দেখুন পিতৃতান্ত্রিক আর্যদের মধ্যে পরাক্রমশালী দেবী কিন্তু তখনো নেই। ফলে আর্যদের সঙ্গে বিবাদে মহিলার হাতের মৃত্যুর সম্ভাবনাই নেই। মহিষাসুরের প্রধান শত্রু দেবতা। সুতরাং পুরুষঅবধ্য হওয়া মানেই দেবতারাও তাকে হত্যা করতে পারবেন না।
এবার সমস্ত পুরুষ দেবতারাই মহিষাসুরের হাতে নাকাল হলেন। দরকার পড়লো দেবীর। আর্যসংস্কৃতিতে এভাবেই শক্তি প্রতীকি দেবীতে রূপান্তরিত হলেন অনার্য সংস্কৃতির হাত ধরে। মহিষাসুর নিহত হলো বটে, কিন্তু আর্যসংস্কৃতিতেও মাতৃপুজোর অবকাশ তৈরি হলো প্রবলভাবে। এই মাতৃপুজোর ধারা ক্রমশঃ আরো পরিণতি লাভ করেছে দক্ষিণাকালী পুজোয়।
অনার্য সংস্কৃতির আরো একটা বিশেষ দিক চাষ। খেয়াল করে দেখলে বুঝবেন চাষের প্রতীক সূচিত হয় নবপত্রিকার মধ্যে দিয়ে। সেখানে ধান থেকে শুরু করে কচু পর্যন্ত হাজির। অকালবোধনের সময়টিও বাংলার চাষের মানচিত্রে উৎসবের উপযুক্ত সময়। বাংলার সোনালি ফসল পাট কাটা হয়ে গেছে এ সময়। আউশ, আমন ধান কাটা হচ্ছে হবে ভাব। শীতকালীন ফসল বোনা হবে এই সময়। বর্ষার পরে প্রকৃতি সবুজ হয়ে উঠেছে। শরৎকালীন প্রকৃতির সঙ্গে এই যোগ দেখলে বুঝতে অসুবিধে হয় না চাষের প্রতি এক ধরণের প্রচ্ছন্ন সমর্থন দুর্গাপুজোতে গড়ে উঠেছে। এ প্রকৃতই অনার্য মিশ্রনের ফসল।
দুর্গাপুজো বাংলার সমস্ত পুজোর মধ্যে এমন এক পুজো যা ঠিকমতো অধ্যয়ন করলে বাংলার প্রাণের সুরখানা বোঝা যায়। একাধারে সংহার আরেকদিকে মাতৃমূর্তির এমন অনির্বচনীয় মিলন, একদিকে ধ্রুপদী উপাসনা, আরেকদিকে লোকায়ত সহজভাবের পাশাপাশি সহাবস্থান দুর্গাপুজোকে ধর্ম, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস সমস্ত দিকেই বিশেষ গুরুত্বের স্থান প্রদান করেছে। বৈদিক শক্তি, আদিম ভূমিজ মাতৃশক্তি, এবং সামাজিক প্রভাব, প্রতিপত্তি, সম্পদ উপাসনা সমস্ত মিলে আছে দুর্গাপুজোয়। সর্বোপরি দুর্গাপুজো তার ধর্মীয় পরিধি ছাড়িয়ে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সামাজিক মিলন উৎসব হয়ে উঠেছে। এ পুজোর বিশালত্ব, ধারণার গভীরতা ইত্যাদির জন্য দুর্গাপুজোকে যে অশ্বমেধ যজ্ঞের সমান ফলপ্রদ ধরা হয় তাতে আর বিস্ময় কী!
জনশ্রুতি অনুসারে, হুগলির গুপ্তিপাড়ায় স্থানীয় কিছু গ্রামবাসী এক জমিদার বাড়িতে দুর্গাপুজো দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জমিদারবাড়ির লোকেরা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে এবং পুজোমণ্ডপে প্রবেশ করতে বাধা দেয় । এই ঘটনায় অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, আর কখনও জমিদারবাড়ির পুজোয় যাবেন না, বরং নিজেরাই চাঁদা তুলে মায়ের আরাধনা করবেন। গ্রামের বারোজন যুবক এই উদ্যোগে […]
আশ্বিনে দুর্গাপুজোর উৎসবের রেশ নিয়েই কার্তিকের অমাবস্যায় বাঙালী মেতে ওঠে শ্যামা মায়ের আরাধনায়। দুর্গাপুজোর মতই গৃহস্থ পরিবার থেকে শুরু করে মন্দির ও বারোয়ারি সর্বত্রই কালী পুজোর বিস্তার। দুর্গার মতোই কালীও বাংলার নিজের ঘরের মা হয়ে উঠেছেন আমাদের মানসপুজোয়। কালী প্রকৃতিগত ভাবে উগ্র, ভয়ঙ্করী এবং শ্মশানচারিণী। এই ভয়ানক রূপকল্পনা থেকে মমতাময়ী ঘরের মা কালী হয়ে ওঠার যাত্রা হিন্দুশাস্ত্র ও ইতিহাসের এক আকর্ষনীয় যাত্রা। শুধু ধর্মীয় পরিধি নয়, এই পরিবর্তনের পিছনে লুকিয়ে আছে বাংলার জীবনশৈলী, দর্শন ও সমাজের এক আশ্চর্য বিবর্তনের গল্প।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদনের পাঠ শুনুন 00:00 1X Sorry, no results.Please try another keyword দুর্গা পুজো বাঙালির বচ্ছরকার উৎসব। সারা বছর ধরে বাংলার গ্রাম শহর প্রতীক্ষা করে থাকে উমা বাপের বাড়ি আসবে বলে। আশ্বিনের প্রকৃতির সঙ্গে দুর্গাপুজোর আমেজ যেন এক হয়ে যায়। আশ্বিনের অমাবস্যায় মহালয়া। পিতৃতর্পণের মধ্যে দিয়ে পিতৃপক্ষের শেষ এবং পরবর্তী পনেরো দিন দেবীপক্ষ – লক্ষীপুজোয় […]